বিশ্বস্ত প্রাণীদের হত্যা করার জন্য যে পাপ নির্ধারিত হয়েছে, সেই একইরকম পাপ তাদের জন্যও জন্ম নেয়, যারা দ্বিজদের প্রতি বিদ্বেষ পোষণ করে আনন্দ পায়। আবার যারা অন্যের নিন্দা করে সুখ পায়, তাদেরও পাপ থেকে মুক্তি নেই। যারা পাপাচারে লিপ্ত থেকেও রাতে দই বা ভাজা চিড়া খায়, কিংবা যারা বেগুন, মুলা, সাদা বা লাল রসুন খায়, তারাও পাপের ভাগী হয়। এইসব কথা জানার পর, বাঘটি নিশ্চিত হয়ে বলল, ‘‘এটা যেন কেউ মনে না করে যে আমি তাকে প্রতারণা করেছি।’’ এরপর সে বলল, ‘‘কাপিলা, যাও, তুমি তোমার সন্তানকে দেখে এসো, হে সন্তানপ্রেমী মা।’’ তখন কাপিলা তার মা, ভাই, বন্ধু ও আত্মীয়দের দেখতে পেল। তার মুখ অশ্রুতে ভিজে গেল, দুঃখে ভারাক্রান্ত হয়ে সে গোবর্ধনের দিকে রওনা দিল। ভয়ে কাঁপতে কাঁপতে, দুঃখ-সমুদ্রের মধ্যে ডুবে, সে বারবার ছুটে অবশেষে নিজের গোবর্ধনে পৌঁছাল। তার কণ্ঠস্বর শুনে বাছুরটি তার মাকে চিনতে পারল। কিন্তু মা যে সময়ে ফিরে এসেছে, তা ছিল অস্বাভাবিক, এবং তার উপস্থিতি ছিল ভয়ঙ্কর ও আশ্চর্যজনক। বাছুরটি জিজ্ঞেস করল, ‘‘বলো তো মা, তুমি এই অদ্ভুত সময়ে কেন এসেছ?’’ মা বললেন, ‘‘আমি তোমার প্রতি স্নেহবশত এসেছি; তুমি যেমন চাও, তোমার ইচ্ছা পূর্ণ করো।’’ তিনি আরও বললেন, ‘‘হে ছেলে, মায়ের সঙ্গে এই সাক্ষাৎ দুর্লভ, আবার হবে না। আমাকে এখন সেই রূপপরিবর্তনকারী বাঘের কাছে আমার জীবন দিতে হবে। আজকেই আমাকে পশুরাজের সামনে যেতে হবে। তোমার সঙ্গে আজ প্রাণ ত্যাগ করা আমার জন্য সত্যিই গৌরবের বিষয়।’’ তিনি বললেন, ‘‘তুমি না থাকলেও আমাকে একা মরতে হবে। মায়ের প্রতি নিবেদিতদের যে ভাগ্য, সেটাই আমার হবে। অথবা, তুমি এখানে থেকো; তোমার ব্রত যেন আমার হয়। মা ছাড়া আমার কাছে জীবন প্রিয় নয়। মায়ের মতো রক্ষক কেউ নেই, মায়ের পথের মতো কোনো পথ নেই। সকল প্রাণীর মৃত্যু তো এক; এতে ভিন্ন কিছু নেই।’’ তিনি বললেন, ‘‘হে সন্তান, এটাই তোমার মায়ের শেষ এবং শ্রেষ্ঠ উপদেশ। বনভূমিতে সদা সতর্ক থেকে বাস করবে, লোভে পড়ে বিপজ্জনক স্থানে এক টুকরো ঘাসও তুলবে না। লোভে বিভ্রান্ত হয়ে মানুষ সমুদ্র, অরণ্য ও যুদ্ধে প্রবেশ করে। মানুষ তিনটি জিনিসে কষ্ট পায়—লোভ, অসতর্কতা ও ভুল বিশ্বাসে।’’ ‘‘তাই, হে সন্তান, সর্বদা প্রচেষ্টায় নিজেকে রক্ষা করবে। অরণ্যে ঘুরে বেড়ানোর সময় পশু ও দুষ্ট জন্মের প্রাণীদের থেকে সতর্ক থাকবে। আমাদের উত্তর শোনো, যা দুঃখ নাশ করে—যেমন বিশ্রাম শেষে মানুষ ফিরে আসে, তেমনই প্রাণীদেরও সাক্ষাৎ হয়।’’ এরপর সবাই সেখানে একত্রিত হয়ে মা এবং বন্ধুদের দেখল। তখন ছেলের জন্য দুঃখে কাতর হয়ে মা বললেন, ‘‘আমার ছোট ছেলে ফেনাপা অসহায়, দুর্বল ও দুঃখী। এই ছেলে ভবিষ্যতের জন্য নির্ধারিত, বিশেষত এখন। সে বিপজ্জনক স্থানে ঘোরে, অন্যের পালেও ঘোরে।’’ ‘‘হে মহাত্মারা, আমাকে ক্ষমা করবেন; আমি সত্যের ওপর নির্ভর করে চলি, তাই এখন চলে যাচ্ছি।’’ মায়ের এই কথা শুনে, সেখানে উপস্থিত সকল নারী গভীর দুঃখে ভরে উঠল।